Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

আবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চার ব্যাংক দেখে নিন কোনগুলো।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে: চারটি সরকারি ব্যাংকের করুণ চিত্র


বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সাম্প্রতিক সময়ে এক গভীর সংকটে পতিত। খেলাপি ঋণ, তারল্য ঘাটতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ব্যাংক “ভেতরে ভেতরে” দেউলিয়ার পথে হাঁটছে।

অনেকে বলছেন—একসময় “অটুট” নামে পরিচিত সরকারি ব্যাংকগুলো আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, নীচে চারটি উল্লেখযোগ্য ব্যাংক এবং তাদের সংকটে পতনের কারণ ও প্রস্তাবিত পথ তুলে ধরা হলো:


১. জানতা ব্যাংক (Janata Bank)

অবস্থা ও সংকট:

  • জানতা ব্যাংক বর্তমানে সব থেকে খারাপ অবস্থায় থাকে বলে বিবেচিত হচ্ছে।
  • ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৭০,৮৪৫ কোটি টাকা, যা তার মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৭৫ % এর মতো।
  • খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রায় বন্ধপ্রায় অবস্থায়, এবং প্রধান ডিফল্ট ঋণগ্রহীতাদের থেকে প্রাপ্তি সম্ভাবনা খুব কম।
  • ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ও প্রভিশন ঘাটতি গভীর—অর্থাৎ, খেলাপি ঋণের ক্ষতির জন্য কোনো পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই।
  • ব্যাংকের বড় অংশ ঋণ কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েকটি কর্পোরেট গ্রুপের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল।

কারণসমূহ:

  • রাজনীতির দখল ও পরিচালনায় হস্তক্ষেপ: ব্যাংকের বোর্ড ও ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাবের দিশাহীন প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
  • ভয়াবহ “ক্রনি ক্যাপিটালিজম” (রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী অংশীদারিত্ব) প্রক্রিয়া: অর্থ খাতকে প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • ঋণগ্রহীতাদের প্রতি কম তদারকি ও সংগ্রহমাধ্যমের ব্যর্থতা।
  • প্রভিশন (সুরক্ষার টাকা) যথাযথভাবে না রাখায় বোঝা বাড়েছে।
  • সুদের উপযোগী ও লাভবান প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে চড়া সুদের ঋণ ও বিকল্প প্রকল্পে ঝোঁক।

সম্ভাব্য সমাধান ও সুপারিশ:

  • খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে বিতর্কমুক্ত পুনরায় কাঠামোর সমঝোতা (rescheduling) ও দায়ভার ভাগাভাগির উদ্যোগ।
  • সরকারকে যোগ্য মূলধন ইঞ্জেকশন দেওয়া ও প্রভিশন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া।
  • বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদার ও স্বচ্ছ নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি।
  • বড় ডিফল্ট ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম।
  • এক এগারো (forensic audit) ও স্বচ্ছ তদারকি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

২. অগ্রনি ব্যাংক (Agrani Bank)

অবস্থা ও সংকট:

  • অগ্রনি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এবং প্রভিশন ঘাটতি তীব্রভাবে বেড়েছে।
  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যানুযায়ী, খেলাপি ঋণ ২৯,৭২০ কোটি টাকার উপরে, যা ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৪১.৩৫ %।
  • বড় ঋণগ্রহীতারা ব্যাংককে নিয়মিতভাবে সম্পদের ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
  • মূলধন ঘাটতি এবং অনির্ধারিত বোর্ড পরিবর্তন ও নেতৃত্ব শূন্যতা সমস্যা তৈরি করেছে।

কারণসমূহ:

  • কেন্দ্রীকৃত ঋণ অনুমোদন: বড় গ্রুপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ঋণ অব্যাহত হয়েছে।
  • কম তদারকি ও সংগ্রহপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা।
  • প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও সুরক্ষার টাকা না রাখায় ব্যালান্স শিট দুর্বল।
  • রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বোর্ড নিয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতা।

সম্ভাব্য সমাধান:

  • নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয় তদারকি ব্যবস্থা চালু করা।
  • ঝুঁকি ভিত্তিক ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা।
  • বোর্ড পুনর্গঠন ও পেশাদারিত্বে জোর দেওয়া।
  • খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধার উদ্যোগ।
  • সরকারি মূলধন ইঞ্জেকশন ও বিনিয়োগকারীদের অংশ নীতি প্রয়োগ।

৩. রূপালী ব্যাংক (Rupali Bank)

অবস্থা ও সংকট:

  • রূপালি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণের হার দ্রুত বাড়ছে।
  • প্রভিশন ও মূলধনে ঘাটতি রয়েছে, এবং খরচ বৃদ্ধির ফলে মুনাফার রাস্তা বাধাপ্রাপ্ত।
  • নেতৃত্ব শূন্যতা এবং অসংগঠিত বোর্ড কার্যক্রম প্রচলিত।

কারণসমূহ:

  • ঋণ প্রকল্পের মানহীন যাচাই।
  • রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের অনুপ্রবেশ।
  • ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বাজেট ও তহবিল না থাকা।
  • পরিচালনাগত দুর্বলতা ও স্বচ্ছতার অভাব।

সম্ভাব্য সমাধান:

  • বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় পুনর্গঠন।
  • ঋণ অনুমোদনের পূর্ব যাচাই ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ জোরদার করা।
  • সরকারি সহায়তা ও পুনর্বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রাহ্য করা।
  • অডিট ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জন আস্থা ফিরিয়ে আনা।

৪. BASIC ব্যাংক (BASIC Bank)

অবস্থা ও সংকট:

  • BASIC Bank একটি “স্টেট-আধারিত” ব্যাংক হলেও এর অবস্থা শঙ্কাজনক।
  • বিশেষ করে ঋণ অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘাটতির কারণে ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।
  • ইতিহাসগতভাবে এই ব্যাংকে নানা লেনদেন ও স্ব স্বদন্ত দুর্নীতি অভিযোগ রয়েছে।

কারণসমূহ:

  • অপারেশনাল দুর্নীতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম।
  • স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক নিরীক্ষা দুর্বল।
  • তহবিল ঘাটতি, বাজেট পূরণের অভাব।
  • ঋণ গ্রহীতাদের অধিক সময় পুনর্বিন্যাস এবং দেরী করা সিদ্ধান্ত।

সম্ভাব্য সমাধান:

  • অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা প্রণয়ন।
  • দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা ও বিচারিক তদন্ত।
  • বোর্ড ও পরিচালনায় পেশাদার নিয়োগ।
  • সরকারী মূলধন ও পুনরুজ্জীবন তহবিলের সদ্ব্যবহার।
  • স্বচ্ছতা ও নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা।

সামগ্রিক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতের পথ

  • গুরুতর খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans, NPL):
    দেশের ব্যাংক খাতে কাগজে প্রকাশিত খেলাপি ঋণ ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
    বেশ কিছু অর্থ যেটি “গোপন খেলাপি ঋণ” হিসেবে রূপ দেয়ার চেষ্টা হয়, তা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।

  • রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও করপোরেট খেলাধুলা:
    ব্যাংকের বোর্ড ও ঋণ অনুমোদনে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী লবিং প্রবণতা ব্যাপক।
    “ক্রনি ক্যাপিটালিজম” (ব্যবসায়ী + রাজনীতিবিদ শক্তির মিল) ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্বার্থান্বেষী মডেলে পরিণত করেছে।

  • নিয়ন্ত্রক ও তদারকি দুর্বলতা:
    বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে তদারকি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
    ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে, তাদের মাধ্যমে রেটিং “মসৃণ” দেখিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

  • আস্থা সংকট ও তারল্য সমস্যা:
    গ্রাহকরা আমানত উত্তোলন করতে চাইছেন এবং ব্যাংকগুলোতে নগদ রিজার্ভ সংকট দেখা দিচ্ছে।
    তারল্য সংকট থাকলে ব্যাংক কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব হবে।

  • ** সরকারের প্রতিকার:**
    কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যেই দুর্বল ইসলামী ব্যাংকগুলোকে একীভূত (merger) করার উদ্যোগ নিয়েছে।
    সরকারের মূলধন ইঞ্জেকশন, আইন সংস্কার ও দায়শীলতা নিশ্চিত করাও কার্যকর পন্থা হতে পারে।


উপসংহার: আশার আলো বা মহাপরিবর্তনের চাবিকাঠি?

সরকারি ও রাষ্ট্র-আধিকৃত ব্যাংকগুলোর মধ্যে চারটি — জানতা, আগ্রাণি, রূপালী ও BASIC — এমন এক ভয়াবহ পথে রয়েছে যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন যদি পরিষ্কার পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া সম্ভব নয়।
এই ব্যাংকগুলোর সমস্যার মূল সূচক হলো শাসন (governance) দুর্বলতা, রাজনীতি-অর্থ-দুর্নীতি সংযোগ, তদারকি ও অডিট ব্যবস্থার ঘাটতি

পরবর্তী করণীয় (শুরুর দৃষ্টিকোণ):

  1. সরকারের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ ফরেনসিক অডিট ও তদন্ত চালানো।
  2. ব্যাংক বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় পেশাগত ও স্বজ্ঞ উদ্ধার।
  3. মূলধন পুনরায় সজ্জাজনকভাবে ইনজেকশন ও প্রভিশন বৃদ্ধির পরিকল্পনা।
  4. খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ পদক্ষেপ ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধার।
  5. রাজনীতি থেকে ব্যাংকিং নীতিকে মুক্ত রাখা—নিয়ন্ত্রক ও অডিট সংস্থার স্বায়ত্তশাসন।
  6. দীর্ঘমেয়াদে, কিছু দুর্বল ব্যাংককে বন্ধ বা একীকরণের পথ নেওয়া।


Post a Comment

0 Comments