রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ফরেনসিক অডিট কেন হয় না? কারণ, প্রভাব সমাধান
বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ কেলেঙ্কারি, আর্থিক দুর্বলতা ও অনিয়ম নিয়ে প্রায়শই আলোচনা হয়। এ ধরনের অভিযোগ ও ঝুঁকির ফাঁকে ফরেনসিক অডিট (forensic audit) একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে যা অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা এনে দিতে পারে, দোষীদের চিহ্নিত করতে পারে এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ উন্মোচন করতে সক্ষম। তবুও, বাস্তবে রাষ্ট্রায়ত্ত (গণ-স্বত্বাভুক্ত) ব্যাংকগুলোতে ফরেনসিক অডিট প্রচলিত নয়, বা প্রস্তাব থাকলেও তা প্রায়ই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। নিচে মূল কারণ, প্রভাব ও সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করা হলো।
ফরেনসিক অডিট কি?
- ফরেনসিক অডিট এমন একটি নিরীক্ষণ পদ্ধতি যেখানে আর্থিক নথিপত্রের মাধ্যমে সম্ভাব্য জালিয়াতি, প্রতারণা, অব্যবস্থাপনা এবং আইন উলঙ্ঘন খুঁজে বের করা হয়। সাধারণ অডিটের চেয়ে এটি আরও গভীর, প্রমাণভিত্তিক ও প্রায়শ্চিত্ত (legal) সুযোগ তৈরি করে।
- এটি আদালতে স্বীকৃত প্রমাণ হিসাবে ব্যবহারযোগ্য নথি তৈরি করতে সাহায্য করে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট কেন হয় না: প্রধান কারণসমূহ
নিচে কয়েকটি গবেষণা ও সংবাদসূত্রের ভিত্তিতে রাজনীতিক, আইন-নৈতিক ও প্রশাসনিক বাধার সারমর্ম দেওয়া হলো:
-
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড, ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রশাসনিকভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফরেনসিক অডিট করলে বোর্ড সদস্য, উচ্চ কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক চরিত্রের বিবরণ সামনে আসতে পারে যা সরকার ও সংশ্লিষ্টদের জন্য অস্বস্তিকর হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় পুরোদমে অবস্থা স্বীকার করেছে যে, তারা প্রস্তাবিত ফরেনসিক অডিটে রাজি নয় কারণ “সরকার এসব ব্যাংকের সমস্যা সমাধানে ‘নিজস্ব’ সমাধান পন্থা অগ্রাধিকার দেয়।” -
আইনি ও নীতিগত বাধা
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কোম্পানি আইন, ব্যাংকিং নীতি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণগুলোর মধ্যে ফরেনসিক অডিট বাধ্যতামূলক করার কোনো স্পষ্ট ধারা না থাকতে পারে। যদিও ব্যাংক কোম্পানি আইন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরীক্ষণ নির্দেশিকায় কিছু নিয়ম রয়েছে, কিন্তু সেটা অব্যাহতভাবে ফরেনসিক পর্যায়ের তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত নয়। -
গোপনীয়তা ও প্রকাশ্যতার ভয়
একটি ফরেনসিক অডিট করলে নীচু ডেটা-বিভাগ, ঋণগ্রহীতা তালিকা, বোর্ড এর রোল, সিস্টেমে দুর্নীতি বা অন্য কোনো অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পেতে পারে। এসব তথ্য সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য রাজনিতিক ও সামাজিকভাবে বিপজ্জনক হতে পারে। -
অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব
ফরেনসিক অডিট করলে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ব্যাপক নথিপত্র যাচাইকরণ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এসব কাজের অভিজ্ঞতা কম এবং খরচ বেশি। সরকার কোন বিদেশী বা স্বতন্ত্র নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানকে আনতে হলে তার অনুমোদন এবং খরচের উৎস সংক্রান্ত জটিলতা থাকে। -
জনগণের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বাস-হ্রাস
যদি ফরেনসিক অডিটে বড় ধরনের অনিয়ম বেরিয়ে আসে, জনগণের ভাবনা হতে পারে যে এ ধরনের ব্যাংক সরকার পরিচালনায় থাকা উচিত কি না; এভাবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বা বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। সরকার এই ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে পারে। -
মূল্যায়ন ও অগ্রাধিকার বিষয়ক পার্থক্য
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে অন্যান্য খাত যেমন অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদির বিষয়গুলোর দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়। ব্যাংক পুনরুদ্ধার বা দক্ষতার বিষয়টি হলেও, ফরেনসিক অডিটকে প্রাথমিক অগ্রাধিকার হিসেবেই দেখা হয় না অনেক সময়।
সংবাদ ও প্রেক্ষাপটে উদাহরণ
-
৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট প্রস্তাব বাতিল
আগস্ট ২০২৫-এ সরকার বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংককে ফরেনসিক অডিট করার প্রস্তাব ছিল। -
WB-র প্রস্তাব এবং সরকারের অবস্থান
বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে বহুবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট করা হোক। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি, কারণ ‟গভীর ঘাঁটাঘাঁটি হলে রাজনীতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয় ঘেঁটে আসতে পারে” বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। -
ব্যাংক খাত সংস্কার: টাস্কফোর্স, AQR ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উদাহরণ
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে টাস্কফোর্সের সুপারিশে কিছু ব্যাংকে ইতিমধ্যেই নিরীক্ষা এবং AQR (Asset Quality Review) করা শুরু হয়েছে, যা ফরেনসিক অডিটের কাছাকাছি একটি পদ্ধতি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট হলে কী ধরণের প্রভাব পড়তে পারে?
- অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির প্রকৃত মাত্রা জানতে পারা যাবে, ঋণ কেলেঙ্কারির হিসাব বৃদ্ধি পাবে।
- প্রেসক্রিপশন বা “responsibility” স্পষ্ট হবে – কোন ব্যক্তি বা টিম কোন সময়ে কি কাজ করেছে, ভুল করেছেন কি না।
- সরকারি ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন পাবে এবং নন-পারফর্মিং লোন (NPL) কমানো সহজ হবে।
- জনগণের আস্থা বাড়বে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সাহায্য বা বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস জোরালো হবে।
- সুস্পষ্ট রিপোর্ট ও প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
সম্ভাব্য পথ ও সুপারিশ
-
আইন ও নীতিমালা সংশোধন করা
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ব্যাংকিং গবর্নেন্স নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিকা এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে ফরেনসিক অডিট বাধ্যতামূলক হয়, বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য। -
স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা নিয়োগ
ফরেনসিক অডিট হলে অবশ্যই এমন একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব নিতে হবে যাঁর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নেই। -
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো ও দক্ষতার উন্নয়ন
ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল রেকর্ড, স্বচ্ছতার ডেটাবেস তৈরি ও সক্ষম ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান/নিরীক্ষক ইনস্টিটিউট নির্বাচন করা। -
গোপনীয়তা বজায় রেখে সুনির্দিষ্ট সময়সীমায় রিপোর্ট প্রকাশ
তদন্তের সময় গোপনীয়তা থাকতে পারে, তবে শেষে স্বতন্ত্র রিপোর্ট জনগণের জন্য প্রকাশযোগ্য হতে পারলে বিশ্বাস সৃষ্টি হবে। -
আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ
যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি, IMF ইত্যাদির সহায়তায় বিদেশী ফরেনসিক অডিট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা যেতে পারে। -
সুশাসন ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা
যারা ব্যাংকের বোর্ডে নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের পারদর্শিতা ও সততার দৃষ্টিতে যাচাই করা হোক; রাজনীতির পক্ষপাতগ্রস্ত নিয়োগ কমানো হোক।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ফরেনসিক অডিট অনুপস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি একটি বড়ভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু যেখানে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং জনগণের আস্থা খাটোতে পারে। তবে, উপরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ফরেনসিক অডিট শুধু হিংস্র তদন্ত নয়, এটি একটি উত্তরণমুখী পথ যেখানে সরকার, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক ও জনগণ মিলেমিশে কাজ করলে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
Keywords:
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ফরেনসিক অডিট, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক, আইন, নীতি, দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি, আর্থিক স্বচ্ছতা

0 Comments